প্রথম বিদেশ ভ্রমণ

by Suman Kundu on August 23, 2014

গত বছর আজকের দিনটা কেটেছিল বেশ একটা রোমাঞ্চের মধ্যে। আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণের হাতছানি। অথচ ভিসার ছাপ লাগানো আমার পাসপোর্টটা তখনো এসে পৌঁছায়নি। পরদিনই আমার ফ্লাইট। ট্রাভেল এজেন্ট জানিয়েছিল তারা যথাযথ প্রচেষ্টা করবে। অনেকের কাছে শুনেছি অনেক সময় নাকি বিমান বন্দরে পাসপোর্ট হাতে পায়। তাই আশা তখনও ছিল। সন্ধ্যের সময় পাসপোর্টটা হাতে পেলাম। তাই যাওয়াটা অবশেষে হয়েছিল। প্রথমবার ভারতের বাইরে পাড়ি দেওয়ার অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা বেশ কঠিন। প্রথমবার নতুন দেশে, নতুন মানুষের মাঝে। আমার বিদেশ ভ্রমণের সূচনা॥

আজ ট্রেনে চলেছি ব্যাঙ্গালুরু। সেই অবসরে পুরানো স্মৃতি ঘেঁটে সেই অভিজ্ঞতার টুকিটাকি পাঠক বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নিতে মন চাইছে। কিন্তু সুরু কোত্থেকে করব! বিদেশি মুদ্রা। ট্রাভেল কার্ড। আন্তর্জাতিক বিমান। নাকি ওসব বাদ দিয়ে, বিদেশে পদার্পণ॥

দুবাই বিমানবন্দরে আমিআমার আগের লেখাটি যদি পড়ে থাকেন তো আপনারা অবশ্যই জানেন আমি কোন দেশে গেছিলাম। ব্রাজিল। কলিকাতা হইতে ব্রাজিলের সাঁও পাওলো বেশ দুর। ইমারত বিমানে গেলে দুবাই শহরে বিমান পরিবর্তন করতে হয়। এখান থেকে দুবাই পাঁচ ঘণ্টার উপরে। সেখান থেকে আরও ১৪ ঘণ্টার পথ। বিমানে এত ঘণ্টার সফর আগে কখনো করিনি। বিমানে সর্বাধিক যাত্রা বলতে ২ই আরাই ঘণ্টার। তাও ভারতের মধ্যে। এক অজানা শব্দ জেট ল্যাগ। তা সে খায় না মাথায় দেয় কে জানে। তাই একটা ভীতি মনের মধ্যে ছিল। তাই যখন এক বন্ধু, দুবাই দেখার প্রস্তাব দেয়, তা আমি বাতিল করি। পাঠকদের একটা বিশয় জানাই। ৮ ঘণ্টার বেশি দুবাইয়ে পরবর্তী বিমানের অপেক্ষায় থাকতে হলে ইমারত বিমান সংস্থার ‘দুবাই কানেক্ট’ পরিষেবার সুবিধা নেওয়া যায়। এই ব্যবস্থার সঠিক ব্যাবহার আমার সেই বন্ধুটি করেছিল। আমার যুক্তি অবশ্য একটু আলাদা ছিল। শুনেছিলাম দুবাই বিমান বন্দরটি বিশাল এলাকা জুরে। আর বাইরে তো সেই বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ান্ডার। তার উপরে মাফিয়া শহর। বাইরে জাওয়া টা না জানি কি বিপদ ডেকে আনে। যদিও এ সম্ভাবনাটি খুবই মৃদু তথাপি বাইরে না বেরিয়ে বিমানবন্দরটাই দেখব ঠিক করি॥

আলোঝলমলে বিমানবন্দরমরু দেশ - দুবাই যখন পৌঁছুলাম তখন ওখানের সময় অনুযায়ী রাত ১২টা অতিক্রান্ত। আমাদের সংযুক্ত পরিবহন সকাল ৮:৩০ নাগাদ। সময় হাতে অনেক। বিমান থেকে বিমান বন্দর প্রবেশ করার জন্য প্রায় ১২ থেকে ১৫ মিনিট বাসে করে যেতে হল। আয়তনটা বেশ টের পেলাম। মরুদেশ সম্পর্কে একটা ধারনা ছিল। সে দেশ নাকি ভীষণ গরম। ধূলি ঝড়। আর উঁচু বালির পাহাড়। প্রযুক্তির যুগে তা যে সম্পূর্ণ বিপরীত করা জায়। সে উপলব্ধি করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। ঝাঁ চকচকে বিমান বন্দর। কৃত্রিম আলো। সূজ্জিকেও হার মানায়। আর গরম? সে-জিনিস কি তা বোঝা দায়। আমার তো রীতিমত ঠাণ্ডা লাগছিল। আফশোস হচ্ছিল কেন শীতবস্ত্রটা মালপত্রর সাথে রেখেছিলাম। চেয়ারে বসে ঘুমানোর সময় এতটাই শীত করছিল যে ঘুমটাই ঠিক ঠাক হল না। শেষে কানে ইয়ার ফোনটা লাগিয়ে একটু স্বস্তি পেলাম॥ দুবাই বিমানবন্দরের গাছপালা

সারা রাত জেগে থাকা বিমান বন্দরটির এক মাথা থেকে আরেক মাথা ঘুরতে ঘণ্টা দুই বেরিয়ে যায়। একটা কথা এখানে না বলে পারছি না। ফেরার দিনের ঘটনা। দুবাই থেকে আমার কিছু কেনাকাটা করার ছিল। হাতে সময়ও কম ছিল সেদিন। কেনাকাটা সেরে দেখলাম আমার বিমান অন্য ব্লকে দিয়েছে। চিহ্ন লক্ষ করতে করতে পৌঁছলাম এক রেল স্টেশনে। সেখান থেকে ৫ মিনিটের ট্রেন নিয়ে গেল নির্ধারিত ব্লকে। সে সময় উপলব্ধি করলাম যাওয়ার দিন যেখানে ঘুরে ২ ঘণ্টা কাটিয়েছিলাম বা যেখানে কেনাকাটা করছিলাম সেটা মোটে এক তৃতীয়াংশ। সেরকম বড় অংশ আর ২টি আছে। যাদের দূরত্ব ট্রেনে অতিক্রম করতে হয়॥

প্রথম ওয়াইন - গোদা বাংলায় বলে মদ। একটু ভাল ভাবে বলতে চাইলে সূরা বলতে পারেন। আবার দেবতাদের পেয় সোমরস। জানিনা আধুনিক যুগের বিভিন্ন মদের মধ্যে সোমরস কোনটি। বিয়ার, হুইস্কি, ওয়াইন নাকি শ্যাম্পেন। জাই হোকনা কেন, আগে কোনটাই সেবন করা হয়নি আমার। এলকোহল বলতে ঔষধের দৌলতে। আন্তর্জাতিক বিমানে বিনে পয়সায়। ওয়াইন খেয়ে দেখার একটা পুরানো সাধ ছিল। সেটা পূরণের এর থেকে ভাল সুযোগ আর কি বা হতে পারে। প্রথমে হোয়াইট, পরে রেড। টুরে দুটোই চেখেছিলাম। এবং বলতে আপত্তি নেই, বেশ ভালই লেগেছে। তাই ওর পরেও আরও কয়েকবার সুযোগ পাওয়ায় হাতছাড়া করিনি। এতো গেল আমার প্রথম আন্তর্জাতিক বিমানের অভিজ্ঞতা। এবারে ব্রাজিলের কথা বলা যাক॥

আমাদের হোটেল আমাদের হোটেলের ছাদথেকে সাঁও পাওলো ব্রাজিল- ব্রাজিলের দুটি শহর দেখেছি। সাঁও পাওলো আর রিও দে জেনেরিও। আমাদের পুরো প্রোগ্রামটাই সাঁও পাওলোতে ছিল। রিওটা আমাদের নিজেদের পরিকল্পনা। বেড়ানোর জন্য। সাঁও পাওলোতে নাবতে বিকেল হয়ে গেল। পাসপোর্টে স্ট্যাম্প লাগিয়ে বেরোতে আরও একটু দেরি হল। আমাদের ওয়ার্কশপ কমিটি গাড়ী পাঠিয়েছিল। সাথে এক প্রতিনিধিও॥

ভাষা - ওখানে সকলে পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলে। আর সেটাই আমাদের মতন দেশ থেকে যাওয়া মানুষের কাছে প্রধান সমস্যার। ইংরাজি প্রায় কেউই ঠিক ঠাক বোঝে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরতরা একটু হলেও বলতে পারে। সাধারণ মানুষের তো অভ্যাসই নেই। আমাদের গাড়ীর চালককে জিজ্ঞেস করেও জানতে পারিনি বিমানবন্দর থেকে আমাদের গন্তব্য কতক্ষণ লাগবে। আমাদের হোটেলে, রিসেপশনে বসে থাকা কর্মচারীও ইংরাজি জানেননা। এখানে বলে রাখা ভাল আমাদের হোটেলটা ইন্টারন্যাশনাল। অন্তত নামে। কফি কিনতে গিয়েও সেই একি সমস্যা। একদিন ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। ফেরার সময়ও একি সমস্যা। কোন বাসে ফিরতে পারব সেটাও কেউ বলে দিতে পারছিল না। তবে একটা কথা স্বীকার না করে পারছিনা। প্রতিটা ব্যক্তিই সাহায্য করেছে। নির্দ্বিধায়। অনেকে যেচে এসে। বিশেষত যারা ইংরাজি একটু আধটু জানেন তারা। আমার আন্তরিক ধন্যবাদ প্রত্যেককে॥

সাইকেল চালানোর রাস্তা আমাদের ওয়ার্কশপ এর পাসে শহর - রাস্তাঘাট দেখলাম বেশ পরিষ্কার। বেশ চওড়া। প্রতিটা রাস্তাতেই প্রায় সাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট লেন রয়েছে। আর গাড়ীঘোড়া যে রাস্তায় ওভাবে চলে সেটা আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি গাড়ীর মধ্যে কম করে চার ফুটের ব্যবধান। আর ভারতে! চার ইঞ্চি পাওয়া দায়। সিগনালে গাড়ী স্টপ লাইন পার করে না। আর ভারতে! জিব্রাও পার করে, সিগন্যালের গোঁড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়। গাড়ী থামা অবস্থায় মানুষ নির্দ্বিধায় জিব্রা ক্রস ব্যাবহার করতে পারে। কোন অসুবিধা হয়না। আমাদের ভারতীয়দের জন্যে সত্যিই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। আমাদের অনুষ্ঠান সূচিতে একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ছিল। সেদিন ওখানের এক পরিচালক রাস্তা পার করার সময় আমাদের বলছিল যে ‘রাস্তা দেখে পার করবেন। এখানে গাড়ী খুব বাজে চালায়। মানুষ দেখলেও থামে না।’ আমার তো রীতিমোতন হাঁসি পাচ্ছিল। ভারতে আসলে না জানি ওনাদের কি অভিজ্ঞতা হবে॥

রাস্তার পাসের বাগান সাঁও পাওলো বাস যদিও ব্রাজিল ডেভেলপিং দেশ, ভারতেরই মতন। তবুও দেখে বেশ পরিপাটিই মনে হল। পরিবহন বেশ আকর্ষণীও দেখলাম। যেকোনো বাসে যেকোনো দূরত্ব ৩ রিয়ালে জাওয়া জায়। সাবওয়েরও একি ভাড়া। এমনটিও শুনলাম যদি কার্ড থাকে তবে ৩ রিয়ালে ২ ঘণ্টা জাওয়া জায়। যেকোনো যানে যতবার ইচ্ছে। লোভনীয়, তাইনা। ব্যাঙ্গালুরুতে যদিও এই ধরনের একটা সুযোগ আছে তবু বাকি ভারতীও শহরে এরকম কিছু আছে কিনা আমার জানা নেই। আমাদের কলিকাতায় এই সুবিধা অন্তত নেই॥

একদিন রাত্রে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। শুনেছিলাম ওখানে অনেক ছিনতাই হয়। আমাদের সাথে সেরকম কিছু যদিও হয়নি। তবে দেখেছিলাম মোটামুটি সব দোকানপাটেই সিকুইরিটির লোক আছে। এমনকি হোটেল গুলিতেও। রাস্তা ঘাটে ঘরছাড়াদেরও দেখেছি। আগেই বলেছি ব্রাজিল উন্নত দেশদের মধ্যে গণ্য হয়না। তাই এসব হয়ত স্বাভাবিকই॥

আর একদিন সাবওয়ে ধরে একটা জায়গায় গেছিলাম। নামটা যতদূর মনে আসছে এভিনিউ দে পলিএস্‌তা। ওটা নাকি আমাদের কলিকাতার পার্ক স্ট্রিটের মতন। শহরের মাঝের ব্যস্ততম জায়গা। আমরা বেশ রাত করেই গেছিলাম। কিন্তু লোকজনের সংখ্যা খুব একটা কম ছিলনা। কলিকাতার মতন বলা যাবে না। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে আমাদের কলিকাতার মতন জনসংখ্যাও ওখানের নয়॥

ইবিরাপুইরা পার্ক সন্ধ্যার প্রাক্বালে Couples ইবিরাপুইরা থেকে সাঁও পাওলো ইবিরাপুইরা পার্কের লাইটগুলি

একদিন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে ঘুরতে গেছিলাম একটা পার্কে। ইবিরাপুইরা পার্ক। সন্ধেটা দারুণ কেটেছিল॥

খাওয়া - যেকোনো ভ্রমণ কাহিনী সেখানকার খাবারদাবারকে বাদ দিয়ে হয়না। তাই এবারে খাবার দাবারে আসা যাক। আমাদের হোটেলে প্রথম দিন খেতে গিয়ে খাবারে খুব লোভ লাগল। দুর্ভাগ্য বসত খেতে বেশ বেগ পেতে হল। গরুর মাংস প্রায় সব পদেই। এমনকি সব্জিতেও। নিরামিষ খাবার ওখানে কেউই খায়না। আর মাংস বলতে প্রধানত গরুর মাংস। আমি হিন্দু। তা বলে গরুর মাংসের বাপারে আমি ততোটা সংযমীও নয়। মানে প্রয়োজনে খেতে আপত্তি নাই। কিন্তু খাবারের একরকম গন্ধ আমার বেশ বাজে লাগছিল। পরে দেশে ফিরে জানতে পেরেছি ওই গন্ধটা ওয়াইন দিয়ে রাঁধলে হয়। আর তাছাড়া মাংসটাও বেশ সক্ত। হয়ত বুড় গরু। তা প্রথম দিন কোনমতে খেয়েছিলাম। হোটেলের মেনুপরে আর খেতে পারিনি। হোটেলের মেনুশুধু ভাত আর লেটুস পাতা খেয়েই রাত কাটিয়েছি। সকালের খাবারটা অবশ্য বেশ জমপেশ হত। প্রচুর ফল থাকতো। পেঁপে, আনারস, তরমুজ, শসা। তবে সবি ওই হাইব্রিড। আর থাকত পাঁওরুটি, কর্ণফ্লেক্স, দুধ ও ডিম। ওয়ার্কশপে দুপুরের খাবারটা দিত। ৩ন দিনই পাস্তা, তাও আবার ভরপুর চীজ। মুখরোচক খাবার বা জলপান, তাতেও চীজ। বিস্কুটের উপরে চীজ। বা সালাডে চীজ। চীজ আর চীজ। আমারতো মনে হচ্ছিল ইতালি হয়ত। ওই চীজ খেয়ে খেয়ে আমার পাস্তাতেও অরুচি এসে গেছিল। দেশে ফিরে অনেকদিন চীজ খেতে পারিনি॥

পাঠকগন জেনে আশ্চর্য হবেন এগুলি একটাও ওদের দৈনন্দিন খাওয়ার নয়। ওদের প্রধান খাবার হল ভাত আর বিন্স মানে আমরা যেটা রাজমা বলি ওই ধরনের রান্না, তবে বিন্সটা আকারে একটু ছোট। সাঁও পাওলো রাজধানী হওয়ায় ওখানে ইতালিও খাবারের আধিক্য এসে পরেছে। আমার আবার স্থানীয় খাবার না খেলে পোসায়না। তাই সুযোগ খুঁজছিলাম। সে সুযোগ পেলাম অনেকটাই পরে। যেদিন সাঁও পাওলো ছেড়ে রিও যাব। সেদিন দুপুরে। খাবারটা আমার মন্দ লাগেনি। তাই যেদিন রিওতে ছিলাম, সেদিন দুপুরেও খেয়েছিলাম রাজমা ভাত আর ফিস ফ্রাই। রিওর খাবারটা বেশি সুস্বাদু ছিল ॥

বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত ছাত্রেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে মাছ ও কচ্ছপ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মারক স্তম্ভ

সবথেকে যেটা ভাল লেগেছিল সেটা হল ওখানকার কফি। ওরকম কফি আমি আজ পর্যন্ত খাইনি কখনো। দুই বাক্স কিনেও এনেছিলাম। শুনেছিলাম আমাজনের মধুও নাকি সুস্বাদু। তবে এক প্রবাসী ভারতীয় নিতে বাড়ন করলেন। বললেন প্যাকেজ করা জিনিস গুলি ভাল হয়না। গ্রামের দিকের থেকে নিতে পারলে। যারা নিজেরা সংগ্রহ করে। তাদের থেকে সরাসরি কিনলে তবেই ভাল জিনিসটি পাবে। তার কথায় যুক্তি আছে বলেই মনে হল। তাই আর মধু আনিনি॥

Comments

blog comments powered by Disqus