বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ

"সর্প নিধন যজ্ঞ শুনেছি। অশ্ব মেধ যজ্ঞ শুনেছি। এমন কি নর মেধ যজ্ঞ ও শুনেছি। কিন্তু বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ তো শুনিনি আগে।' - শিরনাম দেখে এটাই যদি আপনার প্রথম মাথায় আসে। তাইলে আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি বাংলার উন্নতির জোয়ার, আপনি এখনো সাক্ষাত করেননি॥

শিরোনামটি এমত দেওয়ার কিছু কারণ অবশ্যই আছে। অর্জুন পৌত্র পরিক্ষিত মারা যান তক্ষক নাগের বিষ ছোবলে। পরিক্ষিত পুত্র জনমেজয় তখন শিশু। সময় নিয়মে রাজা বড় হতে থাকলেন। উতঙ্ক এসে যখন রাজা জনমেজয়কে জানালেন, তাঁহার পিতার মৃত্যুতে তক্ষক নাগের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তখন রাজা এক বিরাট আয়োজন করলেন। সর্পকুল ধংসের নিমিত্ত। সে মহতী যজ্ঞ, সর্প-নিধন যজ্ঞ নামে পরিচিত। আস্তিক এসে রাজাকে সে কর্ম হতে বিরত না করলে ইহ জগতে সর্পের দর্শন বোধ হয় আর হত না॥

দীর্ঘ কাল স্বার্থান্বেষী আধিকারিক গনের কর্মনাশা সমাজতন্ত্রের বিষে এ বঙ্গে সার্বিক উন্নয়নের অকাল মৃত্যু হয়। সুমতি বাড়লে বঙ্গবাসী জানায়। কর্ম-সংস্কৃতির জন্যই উন্নতি কিছু হয় নাই। সম্রাজ্ঞী এক বিরাট কর্মযজ্ঞের আয়োজন করলেন। সকলে উন্মত্তের ন্যায় সেই যজ্ঞে আত্ম-লেহন করল। শীঘ্রই, ১০০০ (একটা শূন্য ভুল করে লিখেছি ভাববেন না) শতাংশ কর্ম সমাপ্তির ফলে, কাজের বরই অভাব দেখা দিল। অগত্যা নিরপরাধ গাছ গুলিকে যজ্ঞকুণ্ডে আহুতি দেওয়া শুরু হল॥

গল্প দুটির মধ্যে সাদৃশ্য নেহাত কম নয়। যেমন তক্ষকের কারণে অন্যান্য নিরপরাধ সাপ সবান্ধবে যজ্ঞকুণ্ডে আহুত হয়েছিল, ঠিক তেমনি সারে তিন দশকের অপশাসনের কারণে নিরপরাধ গাছগুলি। দুটি তফাৎ তবে ভীষণভাবে লক্ষণীয়। এক, প্রথম ঘটনাটি ঐতিহাসিক হওয়ায়। সে ঘটনা সত্য কি মিথ্যা তা প্রমাণ করে ওঠা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কলিকাতা বাসি একটু চেষ্টা করলেই দ্বিতীয়টির প্রমাণ সহজেই পেয়ে যাবেন। উদাহরণ সরূপ ব্যারাকপুর চিরিয়া মোরে বটবৃক্ষ উড়িয়ে, ঘাস লাগান হল। ওই মোরেই পেট্রল পাম্পের পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছটা বিনা কারণে উপরে ফেলা হল। এরম বহু উদাহরণ আমার পরিসরেই খুঁজে পাই। আপনারাও পাবেন। নিজ নিজ এলাকায়॥

দ্বিতীয় যে অমিলটি আমার মাথায় খুব নাড়া দেয় তা হল - রাজা জনমেজয় ধর্মপরায়ণ ছিলেন। ব্রাহ্মনের উপদেশ তিনি শুনতেন। কাউকে কিছু আশীর্বাদ দিলে তা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। যেমন, তিনি আস্তিককে আশীর্বাদ দিয়ে দেওয়ায় যজ্ঞ বন্দ করেছিলেন। অপরদিকে আমাদের মাননীয়া সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ব্রাহ্মন তো দুরে থাক। কারোর উপদেশেই কর্ণপাত করেন না। যা কথা দেন তা খুব সহজেই ভুলে যেতে পারেন। সুতরাং আস্তিক মুনি যেমত সর্পজাতি রক্ষা করেছিল সেরকম কেউ যদি উদ্ভিদকুল রক্ষার স্বার্থে এগিয়ে আসেন তাঁর দুর্দশা মাওবাদী উপাধি গ্রহণ পূর্বক কারাগার বাসে সমাপ্ত হবে কিনা তা পাঠক গন বিচক্ষণ অনুধাবন করতে পারছেন॥

তবেকি আশার কোন আলোই আর বেঁচে নেই? না সেরম ভাববার সময় এখনও আসেনি বোধহয়। আর সেই আশাটুকু আছে বলেই আমার এই লেখাটি লিখতে বসা। আমার জাওয়া আসার পথেই শত শত গাছ কাটা আমি দেখেছি, কারণে বা অকরণে । পাশাপাশি আমি দেখেছি রাস্তার ধারের ঝুপড়ীর নাপিতটি রোজ জল দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে একটি অশ্বত্থ আর একটি কৃষ্ণচূড়া গাছকে। শনি মন্দিরের সামনের বট গাছ দুটি হঠাতই গজিয়ে উঠেছিল। বৃষ্টির জল পেয়ে এখন ফলফল করছে। কোন এক সহৃদয় ব্যক্তি বাঁশ দিয়ে ঠেকনাও বানিয়ে দিয়েছে। টিনের চাল ওয়ালা চা'উলি শত অসুবিধার মাঝেও, একটু ঠাণ্ডার আশায় উপরে ফেলেনি দরজার সামনে গজিয়ে ওঠা কদম গাছটিকে। "সিদ্ধা'-র লাগানো রাস্তার ধারের গাছ গুলির অধিকাংশ উন্নতির যজ্ঞে বলি হলেও লুকিয়ে চুরিয়ে দু একটি এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু আবার প্রতিবেশীদের যত্নও আদায় করে নিয়েছে। সোদপুর ট্রাফিক মোরের সিভিক পুলিশ দুটি, নিজেদের হাতে জলের ড্রাম, ব্যাটারির খোল দিয়ে দিব্বি টব বানিয়ে ফেলেছে। খোল পচিয়ে সার দিতেও আমি দেখেছি। বড় হচ্ছে দু-তিনটে সবুজ প্রাণ। আর আমি! আমি কি করছি? আমার বাড়ীর ক্ষুদ্র পরিসরে ২টি নিম, একটি করে স্থল পদ্ম, বাতাবি ও পেয়ারা গাছ বড় করছি। কিছু ছোট গাছ ও লাগিয়েছি। আপনারা? আপনারাও নিশ্চয় কিছু না কিছু করছেন॥

জানি ৫০, ১০০, ২০০ এমনকি ৩০০ বছরের পুরানো গাছ অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে ভূপতিত করা কয়েক ঘণ্টার কাজ। অথচ সেই গাছের প্রতিস্থাপন তৈরি করা এক যুগেও সম্ভব কিনা, তা যথেষ্ট সন্দেহের। বিন্দুতে বিন্দুতেই শুনেছি সিন্ধু হয়। তাই হাল ছাড়তে চাইনা। আসুন না আমি আপনি সকলে একে একে আস্তিক হয়ে উঠি। এ বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ বন্ধ হক বা না হক, বৃক্ষ যেন শেষ না হয়। সে চেষ্টাই করি॥

Comments