জয়পুরের সুরঙ্গ পথে

by Suman Kundu on December 01, 2014

সুড়ঙ্গ পথ

এই হল আমাদের সুড়ঙ্গ পথ আবিষ্কারের আগেকার গপ্প। এবারে দেখি সুড়ঙ্গের ভিতরে কি হয়। এক এক করে সকলে সুড়ঙ্গে নাবলাম। বলেছিলাম আমরা ৭ জনে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলাম। সপ্তম জনের ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। পূজা। ওর বাড়ী জয়পুরেই। বছর দুয়েক আগে কিছুদিনের জন্যে আমদের ISI এ এসেছিল। ট্রেইনি হিসেবে। আমাদের সাথে দুদিনই ছিল। আগাগোড়া। আমাদের গাইড করার জন্যে। যাই হোক, সুড়ঙ্গে নেবে দেখলাম বেশ অন্ধকার। আলো দেওয়া আছে বটে। তবে ছবি তুলতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছে।সুড়ঙ্গ ছবি তোলার জন্যে ক্যামেরার সেটিং ঠিক করছি। এমন সময় তিনজন বিদেশির সাথে আলাপ হোল। তেনারা ইংল্যান্ড নিবাসী। একজন আবার বেশ হিন্দি শিখেছে। মাঝে মধ্যে হিন্দি বলছে। আমাদেরকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন "এই পথ কি দুর্গে যাবে?'। আমারা ভাবলাম বুঝি আমের মহলের কথাই জানতে চাইছে। তো সে বিষয় উত্থাপন করতেই বললে, "না না। আমরা জয় গড় দুর্গের কথা বলছি।' ব্যাপারটাতে বেশ একটা রোমাঞ্চের গন্ধ পেলাম। সত্তর পুলিশ প্রহরীর কাছে সবকিছু জানার ব্যাবস্থা করলাম। তারা বললেন বেশি দূর হবে না। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে বামদিকের পথ ধরে। বিদেশিদের তদানুরূপ রাস্তা দেখিয়ে দিলাম॥

আমাদেরও যাওয়ার কথা ওই দুর্গেই। তো প্রস্তাব রাখলাম "চলো হেঁটে এই পথেই পৌঁছে যাই জয় গড়'। দ্বিধা থাকলেও সকলেই রাজি হল। হাঁটতে আরাম্ভ করলাম। সুড়ঙ্গ বেশি দুর নাই। এরপরে দীর্ঘ পাঁচিলের উপর দিয়ে হাঁটা। আমের এ পৌঁছালেই এই পাঁচিল গুলি দেখা যায়। পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত। দেখা ইস্তক আমার চড়তে ইচ্ছে করছিল। সেসুযোগ এই পেলাম। ভাগ্যিস ওই ইংরেজ গুলির সাথে দেখা হল। তবে দুপাশের দেওয়ালের জন্যে এখান থেকে বাইরের কিছুই দেখার উপায় নাই। সামনে পিছনে রাস্তা বাদ দিলে, উপরের আকাশটুকুই দৃষ্টিগোচর হয়। এপথে বেশিলোক নেই। আমাদের সাত জনকে বাদ দিলে ওই বিদেশি ৩ জন। শুরুতে সকলের উৎসাহই বেশ দেখবার মতন ছিল। সন্ময়তো এক প্রস্তর দৌড়েই নিল। সমভূমিতে হয় ব্যাপারটা আলাদা হত। দূরত্ব ২ কিমির মধ্যেই, কিন্তু চড়াই অনেকটা। সকলেরই অবস্থা খারাপ হতে শুরু করল কিছুক্ষণের মধ্যেই। এর মধ্যে দোসর, জলের অভাব।পাহাড়ে বিস্তৃত পাঁচিল পাঁচিল আমরা কেউ আসার সময় জল নিয়ে আসিনি। কেইবা জানতো, সুড়ঙ্গে নেবে এতোটা পথ হাঁটতে হবে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দিব্যার। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওর হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। আমার অবস্থাটা যদিও অতোটা শোচনিও ছিলনা। তথাপি একটু জল মুখে দেওয়ার প্রয়োজন বিচক্ষণ টের পাচ্ছিলাম। রাজস্থান শুষ্ক দেশ। এটাই স্বাভাবিক বোধ হয়। অসুবিধা, তা সে যেমনি হোকনা কেন, আমি ভীষন ভাবে উপভোগ করছিলাম এপথে যাওয়াটা। অনুমান করার চেষ্টা করছিলাম কয়েকশ বছর আগেকার কথা। মুকুট, বর্ম ধারি সৈন্যের এখানে নিত্য আনাগোনা চলত। এই করতে করতে অনেকটাই হেঁটে এসেছি॥

যখন দুর্গের ফটকের সামনে উপস্থিত হলাম, আমাদের কারোরই প্রায় চলার অবস্থা নেই। একটু জল না হলেই নয়। কিন্তু পথ এখনো অনেকটা বাকি। এখান থেকে রাস্তা আরও বেশি খাড়াই। দিব্যা আর রোমি তো বলেই ফেলল। "তোমরা ঘুরে এস আমরা আর যাচ্ছি না।' একটু জল পেলে না হয় সুবিধা হত। কিন্তু এখানেও কোন জলের ব্যাবস্থা নেই। এপথে তেমন পর্যটক আসেনা। তাই কিছুরই ব্যাবস্থা নেই। সন্ময়, জয়ন্ত পা চালিয়ে জলের সন্ধানে আরো উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। আমি রোমি আর দিব্যার বিশ্রামে সঙ্গ দেবার জন্যে ফটকেই বসে রইলাম। আমাদের পরিস্থিতি দেখে ওখানের প্রহরীর একটু দয়া হল। তারা নিজেদের জন্যে রাখা জল থেকে আমাদেরকে একটু দিল। খেয়ে বেশ বল পেলাম। মনকে বললাম। এতদূর এসে ফিরে যাব না। এগুতে শুরু করেই দেখি সন্ময় বলছে আর যেও না। উপরেও জল নেই। সেই দৃশ্য ভোলবার মতন নয়। দুহাত উপরে তুলে সন্ময়ের ছুটে আসা॥

দুর্গের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে বাকিরাআরাবল্লির কোলে আমের শহর ওরা সকলেই থেকে গেল। আমি বললাম। দেখে আসি। এতদূর এসে ফিরে যাওয়ার কোন অর্থই হয়না। ধীরে ধীরে এগুতে থাকলাম। দম আমার আগের থেকে অনেকটাই কমে গেছে। বয়স তো আর কম হল না। আর তাছাড়া সারাদিন বসে বসে কাটান। তবে এরম চড়াই আগেও চরেছি। যোগ ফলসে। ধারনা থাকার দরুন দম বাঁচিয়ে ধীরে ধীরে চরতে থাকলাম। উঠতে উঠতে আমের মহল আর আরাবল্লি পর্বতের মনোরম দৃশ্যের মধু টুকু তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলাম। মধ্যে মধ্যে দাড়িয়ে একটু দমও নিলাম। অবশেষে পৌঁছে গেলাম টিকিট কাউন্টার অবধি॥

জয় গড় ফোর্টে দেখার মুল দুটো জিনিস। এক এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কামান আছে। আর দুই এখানের এক জলাধার অপুর্ব আমের মহল, জয় গড় দুর্গ থেকে পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ চক্রযুক্ত কামানভিঊ পয়েন্ট থেকে আমের মহলের অপুর্ব শোভা। আরও কিছু জিনিস আছে বটে, তবে আমি তাড়াহুড়োর মধ্যে সেই সব দেখতেই যাইনি। আমি যখন তাড়াহুড়ো করে সব দেখছি। তখন আমাদের দলের বাকি সদস্যরা ঠিক করেছে তারাও উঠবে। আমার দেখা শেষ হলে নাবতে যাব। এমন সময় দেখি সুজিতদা গাছের তলায় বসে আছে আর সন্ময় ৪র বোতল জল কিনি নিয়ে পাসে দাঁড়িয়ে॥

জলমহল

আমাদের ন্যাহেরগড় যাওয়া আর হল না। গাড়িকে ফোন করে বললাম আমরা উপরে চলে এসেছি। আমাদের নিয়ে যাও। এরপর আর কোথাও যাওয়ার শক্তিই আমাদের ছিলনা। গাড়িতে করে যখন নাবছি দুপাশের জঙ্গলে একাধিক ময়ূর চরতে দেখলাম। জয়পুর আসা ইস্তক একটাও ময়ূর দেখা হয়নি। মনটা তাই একটু ব্যাকুল ছিল। পরদিন সকালের গাড়িতে ফিরে যাওয়া। ভগবান এ সাধ টুকু যে পূর্ণ করল তাই তাকে ধন্যবাদ। পিঙ্ক সিটির অনেক কিছুই বাদ রয়ে গেল। বাদ রয়ে গেল ভুতুরে দূর্গ (ভানগড়) দেখার সাধটাও। তবে সঙ্গে করে অনেক স্মৃতি কুরিয়ে এনেছি, একথা বলতেই হবে॥

Comments

blog comments powered by Disqus