জয়পুরের সুরঙ্গ পথে

আলবার্ট হল

আলবার্ট হল পরদিন। মানে শনিবার। সকাল সকাল উঠে প্রস্তুত হয়ে নিয়েছিলাম কিছু দুর্গ এক্সপ্লোর করব বলে। ঘুরতে জাওয়ার জন্যে একটা গাড়ি নেব ঠিক করে রাজস্থান টুরিসমে যোগাযোগ করলাম। সেখানে অনেকটা টাকা বলল বলে আমি পকেট হাতরে সেই একটা কার্ড বের করলাম। টাকাটা অনেকটাই কম। বলতে গেলে প্রায় সাত আটশ টাকা কম। তিনটে জায়গা দেখাই মুল উদ্দেশ্য ছিল। আমের-এ রাজমহল, জয়গড় ও ন্যাহেরগড় এ দুর্গ। হাতে সময় থাকায় আলবার্ট হলও দেখব ঠিক করলাম। আলবার্ট হল না গেলে অবশ্য ভাল একটা জিনিস থেকে বঞ্চিত হতাম॥

আলবার্ট হল আলবার্ট হল - সূক্ষ্ম কারুকার্য আলবার্ট হল থেকে ছাদের বারান্দা আলবার্ট হলে - সুরা পাত্র

আলবার্ট হল একটি সংগ্রহশালা। অন্যান্য সংগ্রহশালার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। বাইরের থেকে স্থাপত্যটি দেখবার মতন। সত্যিই অপূর্ব। মারবেল পাথরের তৈরি। আর সেই সব মারবেল কেটে যত্ন করে করা কারুকার্য। সূক্ষ্ম এবং নিখুঁত। যন্তর-মন্তরের সামনে থেকে আমরা কম্বাইন টিকিট কেটে নিয়েছিলাম আগের দিন। তাই এখানে ঢুকতে অন্য কিছু লাগেনি। কম্বাইন টিকিট নিলে ২ দিনে ৭ টা স্থান দেখা যায়। এই সংগ্রহশালার সবথেকে বিশেষত্ব এই যে এর ভিতরেও ছবি তোলা জায়। এই একই ধরনের বেশ কিছু সংগ্রহশালার অভিজ্ঞতার থেকে বলছি। ভারতে এরম সুবিধা খুব বেশি নেই বললেই চলে। সম্পূর্ণটা ঠিক করে দেখতে হলে নয় নয় করে ঘণ্টা চারেক লেগে জাবে। আমরা অতোটা সময় লাগাই নি। একটা বিশয় ভাল লাগল। যে কর্তৃপক্ষ পুরো দেখার ব্যাপারটার দারুণ ব্যবস্থা করে রেখেছে। একের পর এক ঘরে যাওয়ার দিক-চিহ্ন দেওয়া। একদিক দিয়ে ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে আসো। কোথাও হারিয়ে জাওয়ার বা কোন কিছু ছেরে জাওয়ার বা একই রাস্তায় বহুবার জাওয়ার মতন অসুবিধা এক্কেবারেই হয়না। এরম সুবন্দোবস্তও খুব কম জায়গায় হয়॥

শিব দুর্গা আলবার্ট হলে - জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা আলবার্ট হলে - দেহাতী মহিলা

আমের মহল

আলবার্ট হল শেষ করে এগিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য, আমেরের দিকে। আমের মহলটি বেশ বড়। প্রায় ২২টি পয়েন্ট রয়েছে দেখার। গাইডরা তো নাছোড়বান্দা। অফ সিজন। বুঝতেই পারছেন। একজন ছারে তো আর একজন ধরে। কিন্তু পূর্বে গাইডদের নিয়ে যে খারাপ অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছি! বিশেষ করে আগ্রায়। এবারে তাই গাইড নেব না মনস্থির করেই এসেছিলাম। তাই আগে-থেকে পড়াশুনা করে এসেছিলাম। আর খাতায় কিছু নোটও নিয়ে এসেছিলাম॥

আমের মহল ফটকআমের মহল মুখ্য অংশমহলে প্রবেশের পূর্বে একটা কালি মন্দির আছে। যা মহারাজা মানসিং অধুনা বাংলাদেশের যশোর থেকে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু দেবীর সাথে, দুর্ভাগ্য বশত দেখা হল না আমাদের। দুপুরে নাকি তিনি শয়নে জান। আর আমরা ঠিক সেই সময়-এই পৌঁছাই। ১২টা থেকে ৪টে অবধি বন্ধ থাকে। অগত্যা তেনার ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে এগিয়ে চললাম। গাইড ছাড়া দেখতে অসুবিধা মোটেও হল না। আলবার্ট হলের মতই এখানেও প্রতিটা পয়েন্টে নাম্বার করা আছে। ১ ২ ৩ পর পর দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলেই হল। একটা জিনিস খালি মাথায় রাখতে হয়। নম্বর বাদ রেখে এগিয়ে যাওয়া যাবেনা। পরে সেটা দেখার জন্যে ফেরার রাস্তা নাও পাওয়া যেতে পারে। আমাদের সাথেও তাই হল। ৫ নম্বর শেষ করেই, এক ছোট সিঁড়ি দেখতে পেলাম। ছোট এতটাই যে একজন উঠলে আর একজন পাস কাটাতে পারবে না। বেশ অন্ধকার। কারুকার্যহস্তি মস্তক আকর্ষণ অনুভব করলাম। আর উঠে পরলাম। শুনেছি নাকি আগেকার দিনে মানুষ লম্বা চওড়া হত। তাও আবার রাজপুত। যে সিঁড়িতে আমার এই ছোটখাটো চেহারাই কোনমতে আঁটছে সেখানে রাজপুত রাজা রানিরা না জানি কি করে যাতায়াত করত। ৬ নম্বর নিদর্শনটি আগেই দেখতে হত। নম্বরটা লক্ষ করেছিলাম। কিন্তু না দেখেই সিঁড়িতে পা রেখেছি। ৬ নম্বরটিকে আর খুঁজে পাওয়াই গেল না। আমাদের বাদের খাতায়ই রয়ে গেল। অন্ধকার পথ পার করে পৌঁছুলাম শিশমহল। সেখান থেকে এদিক ওদিক। আমি দলছুট হয়ে ঢুকে পরলাম আর একটি চোরা পথে। সেটি রানিদের মহলের দিকে নিয়ে গেল। কোন এক গাইড কে বলতে শুনলাম মানসিং-এর নাকি ১২ টি রানি ছিল। সকলকে সমান জায়গা দেবেন বলে নাকি তিনি মহলের এই অংশটি বানিয়েছিলেন। চতুর্দিকে তিনটি তিনটি করে ঘর। এক একটি এক একটি রানির জন্যে। রানিরা নিজ নিজ ঘরের জানালা দিয়ে মধ্যস্থলে রাজা কে দেখতে পেতেন। এইখানেই বসিত রাজার বৈঠক॥

আমের মহলের মাথা থেকে আরাবল্লি রানির ঘরে ঢোকার জন্যে এখান থেকে একটা সেই একই ধরনের ছোট সিঁড়ি আছে। উপরে উঠলাম। দেখার কিছুই নাই। ফাঁকা ঘর। তবে এক রানির ঘর থেকে অন্য রানির ঘরে সরু পথে জাওয়া জায়। পথ চেনা না থাকলে এখানে একটু হারিয়ে জাওয়ার পরিস্থিতি হতেই পারে। আমি আরও উপরে জাওয়ার একটা পথ খুঁজে পেলাম। সে পথে গেলে মহলের সবচেয়ে উঁচু স্থানে জাওয়া যায়। এখানে আসেনা অনেকেই। এখানে কোন নম্বরও নেই। মানে ২২টি স্থানের বাইরে পরে এটি। গাইড না এনে এটা দেখার সুযোগ বেশ হল। এখান থেকে পাসের দুর্গটা বেশ ভাল দেখা যায়। দেখতে পেলাম আমাদের দলের বাকিরা কোথায় আছে। কিছু ছোবি নিলাম দিয়ে বাকিদের সাথে যোগ দিতে নেমে এলাম। যতদূর সম্ভব হল দেখলাম। দুই একটা বোধ হয় বাদই রয়ে গেল। তারপর বাহির পথে গেলাম। বেশ জল পিপাসা পেয়েছিল। বাহির পথের মুখে ঠাণ্ডা জলে সকলেরই সাময়িক আরাম হল। কিন্তু জলের বোতল কেনার কোন দোকান চোখে পরল না। এখান থেকে বাইরে বেরিয়ে গাড়ী পার্কিং-এর দিকে এগুচ্ছি। চোখ পরল সুরঙ্গ পথের দিকে॥

Read Previous Page Read Next Page

Comments

blog comments powered by Disqus