জয়পুরের সুরঙ্গ পথে

by Suman Kundu on December 01, 2014

হঠাৎ চোখ পড়ল একটা নির্দেশিকার দিকে। লেখা আছে "way to tunnel'। আমার আবার এসবের দিকে ঝোঁকটা একটু বেশি। তাই কাল-বিলম্ব না করে সন্ময়কে বললাম সুরঙ্গে যাবে? সন্ময় আমাদের দলের এক প্রতিভা বলতে পারা যায়। কোন বিষয়ে তার না নেই। সেনাবাহীনিতে যাওয়াই ওর জীবনের মুল উদ্দেশ্য। সে সূত্রে দীর্ঘদিন শরীর চর্চার মধ্যেই ছিল। বছর দুয়েক হল, সে পাঠ চুকিয়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে শরীরের বারোটা বাজছে। সারাদিন একভাবে বসে থেকে থেকে সবকটা জয়েন্টে জং ধরিয়েছে। এতদ সত্ত্বেও উন্মাদনার পারায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি। তাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই এদিক ওদিক কিছু না ভেবেই, একটু সুর কেটে উত্তর দিল "চ__লো__'। একে একে আমরা ৭ জনে সুরঙ্গে নাবতে শুরু করলাম। পথ বেশ সরু। এক একটা সিঁড়ির উচ্চতাও অনেকটা। সাবধানে নিচে নাবতে হয়। গল্পটাকে এগিয়ে নিয়ে জাওয়ার আগে এটা বলা দরকার আমরা এই সুরঙ্গ মুখে এলাম কিভাবে॥

জয়পুর আগমন

হাওয়া মহল, জয়পুরশুক্রবার (সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৪) ভোর ভোর আমরা দিল্লি-আজমের শতাব্দী ধরে এসে পৌঁছাই জয়পুর। রাজস্থানের রাজধানী শহর। আরাবল্লি পর্বতের খাঁজে। আমরা বলতে, আমি, জয়ন্ত, রোমি, দিব্যা, সুজিতদা ও সন্ময়। আমরা সকলেই center for soft computing research, ISI এ কাজ করি। সুজিতদাকে বাদ দিলে বাকিরা গবেষণার কাজে যুক্ত। আর অফিসিয়াল কাজগুলি সুজিতদা করে থাকেন। বছর পঞ্চাশেক বয়স হলেও সুজিতদা খুবই রসিক মানুষ। তাই আমাদের সাথে বয়েসের এতটা ব্যবধান ভ্রমণের কোন সময়েই আমাদেরকে অস্বস্তি অনুভব করায় নি॥

সকালে যখন স্টেশন পৌঁছেছিলাম কিছু গাড়ীর চালকেরা হাতে কার্ড নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক অভিজ্ঞতা। আমি অনেক জায়গাতেই ঘুরেছি। উত্তর বা উত্তর পশ্চিম ভারতে যদিও বা প্রথমবার। তবে গাড়ী চালকেরা কার্ড নিয়ে ঘুরছে। এটা বোধ হয় এই বৈশ্য দেশেই সম্ভব। মারোয়াড়ীর দেশ। এখানে সকলেই ব্যবসাটা বেশ ভাল বোঝেন। আমাদের সাথে বেস কিছু জিনিস ছিল। আর তা নিয়ে ছোটাছুটি করার ইচ্ছেও ছিল না। তাই হোটেলের থেকে পিক আপ নিয়ে নিয়েছিলাম। সেযাত্রায় খালি কার্ড নিয়েই রেহাই পেয়েছিলাম। কার্ডটা অবশ্য কাজে লাগিয়েছি। সে প্রসঙ্গে আসব। তবে হোটেলের কথা যখন উঠলই। সে সম্পর্কে ২ই এক কথা না বললেই নয়॥

হোটেল সাহাপুরা হাউস

সাহাপুরা হাউস, জয়পুরজয়পুরের ভ্রমণ পরিকল্পনার প্রায় সব দায়িত্বটাই আমার উপরে ছিল। হোটেল বুকিং কিম্বা কবে কি দেখব। আমিই ঠিক করেছিলাম। পকেট সাথ দিলে, আমার নতুন কিছু করতে মন্দ লাগেনা। সেই মতন হেরিটেজ হোটেলে বুকিং করেছিলাম। সাহপুরা হাউস। বাকি হেরিটেজ হোটেলের মতন এটাও আমাদের সাধ্যের বাইরেই হত। নেহাত অসময় (off-season), তাই সাত থেকে নয় হাজার টাকার রুম। আমরা পাই তিন হাজারে। এরম হোটেলে আমাদের কারোরই আগে থাকা হয়নি। আমার যদিবা টুকটাক ধারনা ছিল। বাকিদের তেমন কিছুই ছিল না॥

গেটের বাইরে একটা গাছের নিচে নিরাপত্তারক্ষী। গেটটা খুব একটা বড় নয়। বাইরে থেকে তেমন কিছু আহামরিও নয়। কিন্তু ভিতরে ঢুকলে সবকিছু অন্য রকম। সামনে বাঁধানো মেঝের উপরে একটা টাঙ্গা গাড়ী। কাঠের কাঠামো মেহগনি রং করা। আর উপরের সিটটা লাল রঙের। পরিপাটি রিসেপসন। বলতে পারেন আধুনিক। যিনি আমাদের স্বাগত জানালেন তার মুখে আথিতেওতার হাঁসি। দেখে চমৎকার লাগল। চারতারা হোটেল বলে কথা। রিসেপসন শেষ হলেই একটা বারান্দা। সাহাপুরা হাউস, জয়পুর সাহাপুরা হাউস, জয়পুর বারান্দার খোলা দিক দিয়ে সামনের ঘাসের লন দেখা জায়। খুব বড় কিছু না। অল্প কিছু গাছের বাগিচা। বারান্দা থেকে মুল অংশে ঢোকার পথে প্রথম চোখে পরে একটা পাথরের ফোয়ারা। সাদা পাথরের। আর তার পাসে কাল পাথরের নারী মূর্তি। সামনের দেওয়ালে পাথর বাঁধান ফ্রেমের মাঝে পেন্ডুলাম ঘড়ি। ধিমে আলোয় এক মধুর পরিবেশের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে রাত্রে। এখান থেকে সামনে রেস্তোরাঁ দেখা যায়। মুল অংশে রেস্তোরাঁর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সাহাপুরা হাউস, জয়পুর সাহাপুরা হাউস, জয়পুর রেস্তোরাঁর কর্মচারীদের মাথায় লাল রাজস্থানি পাগড়ি। বাঁদিকের ঘরে আমাদের বসাল। এটি প্রতিক্ষালয়। তিন চারটে সোফা। ঘরের দেওয়ালে মারবেলের ফ্রেমের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম রং তুলির কাজ। দরজার ঠিক সামনের দেওয়ালে দুটি তরবারি কিছু ছুরি ও ঢাল সুসজ্জিত। আর অপর দিকে মহারাজাদের ছবি আঁটা। মহারাজ বলতে আমাদের এখানকার জমিদার আরকি। সাহাপুরা গ্রামের মহারাজা। আমাদের কিছুটা সময় লেগেছিল। প্রত্যেকের নাম ঠিকানা লেখা। প্রত্যেকের পরিচয় পত্র দেওয়া। তাছাড়া আমরা একটু আগে ঢুকে গেছিলাম। তাই ঘরগুলি ওঁদের গোছানো হয়নি তখনো। আমি লেখালেখির কাজ করছিলাম আর ওদিকে সন্ময় ও জয়ন্ত ফটো সুট। রুম পরিষ্কার হতে আরও খানিকটা সময় লাগল। আমাদের বেশ খানিক ক্ষণ ওখানেই অপেক্ষা করতে হল। সকলেই বেশ একটু বিরক্তই হচ্ছিলাম। এরকম বসে থাকতে কারই বা ভাল লাগে। তাছাড়া আমাদের আবার বেরবার পরিকল্পনাও ছিল॥

সাহাপুরা হাউস, জয়পুরসাহাপুরা হাউস, জয়পুরখানিক পর এক কর্মচারী আমাদেরকে কিছু অংশের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তার মধ্যে রেস্তোরা এবং মদ্যপানের স্থল যেমন আছে। তেমনি সুইমিং পুল। স্পাও। এইসবে এক ঘণ্টা অতিক্রান্ত হল। তাই যখন শুনলাম ঘর প্রস্তুত। তখন সকলকে বললাম আধাঘণ্টার মধ্যেই তৈরি হতে হবে। কিন্তু তা আর হল না। রুমে পৌঁছান মাত্র বুঝলাম এ মহারাজেরই শয়ন কক্ষ স্বরূপ। ঢুকতেই ডান দিকে ছোট টি-টেবিল, বেতের দুটি চেয়ার পাতা। আর বামদিকে ড্রেসিং টেবিল। চা, কফির পরিপাটি ব্যবস্থা। সাহাপুরা হাউস, জয়পুরসাহাপুরা হাউস, জয়পুর পর্দা দিয়ে সামনের এই অংশটা ঘরের বাকি অংশের থেকে আলাদা করা। ভিতরের অংশে যা দেখলাম তা আরও রাজকীয়। কাঠের খাটটা এতটাই বড় যে তাতে খুব আরাম করে জনা চারেক সোয়া জায়। দেওয়ালে ৫২'' এর TV। পুবের দেওয়াল জুরে লম্বা পালঙ্ক (Divan) সাথে কুশন ও কোল বালিশে পরিপাটি সাজান। আর বাথরুমটা! একটা ছোট খাট ঘরের সমান। বিভিন্ন রঙ্গের আলো। আধুনিক সমস্ত ব্যবস্থা। এত সুন্দর রুম দেখে আর বেরতেই ইচ্ছে করছিল না। এখানেই বুঝি পুরো ছুটিটা কাটিয়ে দেওয়া জায়। দুদিন তো জয়পুর দেখতেই বেরিয়ে যাবে। এই হোটেলে বসে রজকীও সুখানুভব যে এযাত্রায় করতে পারব না সেবিষয় ভেবে সকলেরই মন উদাস হল। এ হোটেলের বুকিং এর শ্রেয়টা আমার উপরে বর্তায়। তাই সকলের থেকেই অনেক ধন্যবাদ পেলাম। এসবের মাঝে ঘণ্টা খানেক অতিক্রান্ত হয়ে গেল। তারপর প্রস্তুতি। ও মধ্যাহ্নভোজ। পরিকল্পনাতে কাটছাঁট করতেই হল। শুধু সিটি প্যালেস, যন্তর-মন্তর আর হাওয়া মহল দেখলাম॥

পরবর্তী অংশ

Comments

blog comments powered by Disqus